গবাদি পশুর অত্যন্ত সংক্রামক ও মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগগুলোর মধ্যে ক্ষুরা রোগ অন্যতম। এই রোগকে ইংরেজিতে Foot and Mouth Disease (FMD) বলা হয়। সাধারণত গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও শূকরের মধ্যে এ রোগ দেখা যায়। ক্ষুরা রোগে আক্রান্ত পশুর মুখে, জিহ্বায়, দাঁতের মাড়িতে, ক্ষুরের ফাঁকে ও স্তনে ফোস্কা সৃষ্টি হয়। ফলে পশু খাওয়া বন্ধ করে দেয়, জ্বর আসে, লালা ঝরে এবং হাঁটতে কষ্ট হয়। দুধ উৎপাদন অনেক কমে যায় এবং খামারির বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়।
Foot and Mouth Disease
ক্ষুরা রোগের কারণ
ক্ষুরা রোগ একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এটি Picornaviridae পরিবারের Aphthovirus দ্বারা হয়। ভাইরাসটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়ায় এবং আক্রান্ত পশুর লালা, দুধ, মল, প্রস্রাব, নিঃশ্বাস ও ক্ষতস্থানের মাধ্যমে অন্য পশুতে সংক্রমিত হয়।
রোগ ছড়ানোর উপায়
- আক্রান্ত পশুর সংস্পর্শে এলে
- একই খাবার ও পানির পাত্র ব্যবহার করলে
- খামারের শ্রমিকের কাপড় বা জুতার মাধ্যমে
- পশুবাহী গাড়ির মাধ্যমে
- হাট-বাজার থেকে নতুন পশু আনার কারণে
- বাতাসের মাধ্যমেও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়াতে পারে
ক্ষুরা রোগের লক্ষণ
সাধারণত ২–১৪ দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ দেখা যায়।
প্রধান লক্ষণসমূহ
- হঠাৎ ১০৪–১০৬°F জ্বর
- অতিরিক্ত লালা ঝরা
- মুখে ও জিহ্বায় ফোস্কা
- মুখ থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়া
- খাওয়া কমে যাওয়া বা বন্ধ হওয়া
- ক্ষুরের ফাঁকে ঘা হওয়া
- খুঁড়িয়ে হাঁটা
- শুয়ে থাকা
- দুধ উৎপাদন কমে যাওয়া
- বাছুরের ক্ষেত্রে হঠাৎ মৃত্যু হতে পারে
ক্ষুরা রোগের চিকিৎসা
ক্ষুরা রোগের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই মূলত উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে পশুকে সুস্থ করা হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসা দিলে অধিকাংশ পশু ভালো হয়ে যায়।
১. আক্রান্ত পশুকে আলাদা রাখা
রোগ ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্ত পশুকে সুস্থ পশু থেকে আলাদা করতে হবে। কারণ এ রোগ খুব দ্রুত ছড়ায়।
করণীয়
- আলাদা ঘরে রাখতে হবে
- আলাদা খাবার ও পানির পাত্র ব্যবহার করতে হবে
- খামারে জীবাণুনাশক ব্যবহার করতে হবে
- আক্রান্ত পশুর কাছে যাওয়ার পর হাত-পা পরিষ্কার করতে হবে
২. জ্বর ও ব্যথার চিকিৎসা
জ্বর কমানো এবং ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করা খুব জরুরি।
ব্যবহৃত ওষুধ
- Meloxicam
- Ketoprofen
- Flunixin Meglumine
- Paracetamol (ভেটেরিনারি পরামর্শ অনুযায়ী)
এই ওষুধগুলো পশুর জ্বর, ব্যথা ও প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
৩. মুখের ঘা ও ফোস্কার চিকিৎসা
মুখের ঘার কারণে পশু খেতে পারে না। তাই মুখ পরিষ্কার রাখা জরুরি।
মুখ পরিষ্কারের পদ্ধতি
- ফিটকিরি মিশ্রিত পানি
- Potassium Permanganate এর হালকা দ্রবণ
- লবণ মিশ্রিত কুসুম গরম পানি
দিনে ২–৩ বার মুখ ধুয়ে দিতে হবে।
ঘায়ে ব্যবহার করা যায়
- Glycerine + Boric Acid
- Mouth spray
- ভেটেরিনারি অ্যান্টিসেপটিক জেল
এতে ঘা দ্রুত শুকায় এবং ব্যথা কমে।
৪. ক্ষুরের ঘা চিকিৎসা
ক্ষুরের ফাঁকে ঘা হলে পশু হাঁটতে পারে না।
করণীয়
- ক্ষুর পরিষ্কার করতে হবে
- জীবাণুনাশক দ্রবণে ধুতে হবে
- শুকনা জায়গায় রাখতে হবে
ব্যবহারযোগ্য দ্রবণ
- Copper Sulphate
- Potassium Permanganate
- Savlon মিশ্রিত পানি
ক্ষতে ব্যবহার
- টেট্রাসাইক্লিন স্প্রে
- অ্যান্টিসেপটিক পাউডার
৫. অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। তবে ক্ষতস্থানে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঠেকাতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।
সাধারণত ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক
- Oxytetracycline
- Amoxicillin
- Ceftriaxone
অবশ্যই পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।
৬. স্যালাইন ও পুষ্টিকর খাবার
আক্রান্ত পশু খেতে না পারায় দুর্বল হয়ে যায়। তাই সহজপাচ্য ও নরম খাবার দিতে হবে।
খাবার
- নরম ঘাস
- ভুসি ভেজানো খাবার
- খৈল
- সবুজ ঘাস
- পরিষ্কার পানি
প্রয়োজনে
- স্যালাইন
- ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স
- ক্যালসিয়াম
- মিনারেল মিক্সচার
ব্যবহার করা যেতে পারে।
৭. বাছুরের বিশেষ যত্ন
বাছুরে ক্ষুরা রোগ হলে হার্ট আক্রান্ত হতে পারে এবং হঠাৎ মৃত্যু ঘটে।
করণীয়
- দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে
- শরীর গরম রাখতে হবে
- দুধ খাওয়ানো চালিয়ে যেতে হবে
- ডিহাইড্রেশন ঠেকাতে স্যালাইন দিতে হবে
ক্ষুরা রোগ প্রতিরোধের উপায়
চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
১. নিয়মিত টিকা প্রদান
ক্ষুরা রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা।
FMD Vaccine
টিকার সময়সূচি
- বাছুর: ৪ মাস বয়সে
- এরপর প্রতি ৬ মাস অন্তর
সব পশুকে নিয়মিত টিকা দিতে হবে।
২. খামারের বায়োসিকিউরিটি
করণীয়
- খামারে জীবাণুনাশক ব্যবহার
- বাইরের লোক প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ
- নতুন পশু ১৪ দিন আলাদা রাখা
- নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
৩. আক্রান্ত পশু দ্রুত শনাক্ত করা
রোগের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত আলাদা করতে হবে এবং চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
৪. হাট থেকে পশু আনার পর সতর্কতা
নতুন পশু সরাসরি খামারে না এনে কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
ক্ষুরা রোগে খামারির ক্ষতি
ক্ষুরা রোগে খামারির ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়।
ক্ষতির ধরন
- দুধ উৎপাদন কমে যায়
- পশুর ওজন কমে যায়
- প্রজনন সমস্যা দেখা দেয়
- বাছুর মারা যেতে পারে
- চিকিৎসা খরচ বেড়ে যায়
অনেক সময় সুস্থ হলেও পশুর উৎপাদনশীলতা আগের মতো থাকে না।
উপসংহার
ক্ষুরা রোগ একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হলেও সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও যত্ন নিলে অধিকাংশ পশু সুস্থ হয়ে যায়। আক্রান্ত পশুকে দ্রুত আলাদা করা, মুখ ও ক্ষুর পরিষ্কার রাখা, জ্বর ও ব্যথা কমানো, পুষ্টিকর খাবার প্রদান এবং নিয়মিত টিকা দেওয়াই এই রোগ নিয়ন্ত্রণের মূল উপায়। খামারিদের সচেতনতা ও নিয়মিত ভেটেরিনারি পরামর্শ ক্ষুরা রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।